সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের প্রথম নৌকা জাদুঘরের দ্বার উম্মোচিত হচ্ছে আগামীকাল

প্রতিবেদকের নাম :
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৭১ সময় দর্শন

মোঃআসাদুজ্জামান
বরগুনা প্রতিনিধি # বাংলাদেশের প্রথম নৌকা জাদুঘরের দ্বার উম্মোচিত হবে আগামীকাল। বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর পরিকল্পনায় জেলা প্রশাসন ভবন সংলগ্ন ৭৮ শতাংশ জমিতে ৮১ দিনে জাদুঘরের নির্মান কাজ স¤পন্ন হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে ১৬৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের নৌকার আদলে নৌকা জাদুঘরটি নির্মান করা হয়েছে। একশত নৌকার মডেল নিয়ে নৌকা জাদুঘরের পরিকল্পনা করা হলেও আপাতত: ৭৫ টি নৌকা নিয়ে আগামীকাল ৩১ ডিসেম্বর, বুধবার বিকাল ৩ টায় নৌকা জাদুঘরের উদ্বোধন হবে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে একটি বড় নৌকা। এর মূল ভবনটি ৭৫ ফুট গলুই ও ২৫ ফুট করে নৌকার পেটের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের নৌকার মডেল। বড় ছোট খাল-নদী-সাগরে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন বিবেচনায় নৌকার প্রকরণ রয়েছে জাদুঘরে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, কালের বিবর্তনে নৌকা এখন খাল-নদী-সাগরে তেমন দেখা না গেলেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পেক্ষাপটে এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অবদান রেখেছে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। যুক্তফ্রন্ট থেকে স্বাধীনতা এবং বর্তমান রাজনীতিতে প্রতীক হিসেবে নৌকা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখছে। বরগুনা বরিশালের অংশ হিসেবে হাজার নদী খাল এমনকি সংশ্লিস্ট সাগরে এক সময় নৌকার আধিপত্য ছিল। যদিও ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও স্পীড বোট বের হয়েছে, যা ধীর গতির নৌকার দ্রত গমন উপযোগি সংস্করণ। এক সময় নৌকা শুধু যানবাহনই নয়- মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা নেয়া, সুন্দরবন থেকে কাঠ সংগ্রহ, নদী সাগরে মৎস্য শিকারসহ বহুল কাজে ব্যবহার হতো। এখন পেশা হারিয়ে বেকার হয়েছে হাজার হাজার মাঝিমাল্লা। এখন তাদের কেউ খোঁজও নেয়না। এমনকি নৌকা নিয়ে গবেষণা বা এর সংরক্ষণে এ যাবতকাল কোথাও তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সে শুন্যতা পুরনে বরগুনার নৌকা জাদুঘর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে জেলা প্রশাসন।

মানিক বন্দ্যোপধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উপন্যাস যা চলচিত্র রূপ পেয়েছে ”পদ্মা নদীর মাঝি’ নামে। মনে পরে সেই মন কারা গাণ, কই যাওরে পদ্মার ঢেউ আমার কথা লইয়া যাওরে—-। নৌকা এবং নদী নিয়ে বাংলার মানুষের যে রূপকথা তা চিরন্তন। যদিও বাংলার সেই চিরন্তন ঐতিহ্য এখন আর নেই। খালগুলো গেছে শুকিয়ে, নদী গেছে ভরাট হয়ে। ধীর গতির নৌকার বদলে তৈরী হয়েছে দ্রত গতির ট্রলার এবং ইঞ্জিন চালিত যান বাহন। নাইওর নিতে এখন আর পানসী বা একমালই কেরায়া নৌকা নদীর ঘাটে আসেনা। বাড়ির সামনের রাস্তায় দাড়ায় অটো বা দামী গাড়ী। এক সময় প্রত্যন্ত আঞ্চলে পুলিশের থানায় নৌকায় আসামী ধরার জন্য নৌকা ব্যাবহার হত। সেই নৌকার মাঝিদের দাপট দারোগাকে হার মানাতো।

বরগুনা-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু জানিয়েছেন, পৃথিবীর আদিকালে জঙ্গলে পড়ে যাওয়া গাছ পেড়িয়ে খাল পাড় হওয়ার চিন্তা থেকে আসে সাঁকো তৈরীর কথা। সাঁকো বা সেতুর পর ভাসমান কাঠ দেখে চিন্তা আসে ভেলা ও নৌকার। সাঁকো দিয়ে খাল পাড় হওয়া যায়, কিন্তু নৌকা দিয়ে নদী পথে যেদিক খুশি সেদিকে যাওয়া যায়। নৌকার আগে আসে ভেলার চিন্তা। নৌকা পৃথিবীর আদি যানবাহন হিসেবে মানবসভ্যতা বিকাশে সহায়তা করে। সুযোগ সুবিধা এবং ব্যবহারের উপযোগিতার কথা চিন্তা করে নৌকার প্রকরণ তৈরী হয়। সারা পৃথিবীতে শত প্রকারের নৌকা ছিল এক সময়। বাংলাদেশেও এক সময় বিভিন্ন প্রকারের নৌকা চলত এলাকা ও নৌপথ ভেদে। যেমন : ডিঙ্গি, একমালই, কেরায়া, কোষা, পানসি, গয়না, কোন্দা, ঘাসি, সাম্পান, লম্বাপাদি, কাঠামী বা রপ্তানি, বাচারি, পাতাম বাইচের নৌকা ইত্যাদি। এগুলো ব্যবহার অনুযায়ী নির্মাণ করা হত। সাগর, নদী, খাল, মালামাল আনা নেয়া, কাছে এবং দূরত্বে আসা যাওয়ায় সক্ষমতা অনুযায়ী নির্মাণ করা হত। নৌকাগুলো সাগর- নদী- খাল পেড়িয়ে মানুষকে তার দৈনন্দিন মালামালসহ পৌছে দিত গন্তব্যে। প্রতিযোগিতা হত নৌকা বাইচের। শুধু আর্থ সামাজিক নয় লোকসংস্কৃতিতে নৌকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তখন এখনকার মত রাস্তা ঘাট ছিলনা। নদী ছিল অরক্ষিত। খোলা বাতাসে মাঝি নৌকায় অনুকূল প্রবাহে পাল খাটিয়ে হাল ধরে উদার গলায় জুড়ে দিতে ভাটিয়ালী গান।

বরগুনা জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান বলেন, বরগুনা নামের সাথেও জড়িয়ে আছে নৌকা। বরগুনা নামের উৎপত্তি হয়েছে বরগুন বা অনুকূল প্রবাহকে নিয়ে। উত্তরাঞ্চল থেকে বাওয়ালীরা সুন্দরবনে কাঠ কাটতে আসা এবং ফিরে যাবার জন্য অনুকূল প্রবাহ বা বড় গোনের জন্য অপেক্ষা করত খাকদোন নদীর তীরে বিষখালীর মোহনার কাছে। বড়গোনের জন্য এই অপেক্ষার স্থানের নামই এক সময় বরগুনা হয়ে যায়। বড় নৌকা, বড় গোন, লগি, বৈঠা, পাল এলাকার মানুষের কাছে অতি পরিচিত উপকরণ ছিল। বরগুনার দু’টি বৃহৎ নদী বিষখালী ও পায়রা। উপকথা ছিল এই প্রমত্তা নদী ও নৌকা নিয়ে। বলা হত ”যে দেয় পায়রা পাড়ি- হ্যার মাউগ অয় দুফার্ইরা রাঢ়ি। ”আবার ”যার স্বামী বিষ খায়- হে বিষখালি পাড়ি দেয়।” নানা কাহিনী রয়েছে এই নৌকা ও নদীকে কেন্দ্র করে। যা আজ বলতে গেলে কিংবদন্তি বা রূপকথা, স্বপ্ন। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরের জন্যই বরগুনায় করা হয়েছে নৌকা জাদুঘর।

গত ৮ অক্টোবর বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির পাশে পুরানো পাবলিক লাইব্রেরি চত্তরে বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার ড. অমিতাভ সরকার। আগামীকাল বরগুনা-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর নৌকা জাদুঘরের উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, মুজিব শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিলুপ্তপ্রায় বাহারী নৌকাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করানোর পাশাপাশি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বঙ্গবন্ধু নৌকা জাদুঘর সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

মোঃআসাদুজ্জামান
বরগুনা প্রতিনিধি

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
২০২০© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ*
সহযোগিতায় রায়তা-হোস্ট ডিজাইন : SmartiTHost
desharkontho-lite