শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:২৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে মাদকসহ ইউপি সদস্য আটক বিসিক ও প্রিজমের তিনটি প্রশিক্ষণ সমাপ্ত কুমিল্লার চান্দিনায় আ’লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ৬ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় ৫প্রার্থী মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ ও জমাদান জুয়েলের গাড়ির বহরসহ কয়েক হাজার মানুষের ঢল  বাউফলে পৌর আওয়ামীলীগের (একাংশের) উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত. নওগাঁর মহাদেবপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস পালন কুমিল্লার দৌলতপুরে গ্যাস সিলিন্ডারের আগুনে ১০ ঘর পুড়ে ছাই  চান্দিনায় গাঁজাসহ ২ নারী মাদক ব্যবসায়ী আটক নওগাঁয় ফরেস্টার আলইয়াদুল বারীর বদলী আদেশ স্থগিতের দাবিতে মানববন্ধন সরিষাবাড়ীতে মাদক, বাল্যবিবাহ, নারীনির্যাতন ও গরুচুরি প্রতিরোধে সমাবেশ অনুষ্ঠিত

ত্রিপুরার কাল বিষাক্ত পানিতে জনজীবন বিপন্ন

প্রতিবেদকের নাম :
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৫ সময় দর্শন
বাদল আহাম্মদ খান
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি
প্রতিবেশী দেশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা শহরে ভূগর্ভস্থ কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে, গত কয়েক দশক ধরে সেখানকার হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, গৃহস্থালির বর্জ্য ও নর্দমার দূষিত পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।
এই দূষিত পানি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে নদীর পানির সঙ্গে মিশে আখাউড়ার জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ১৫ গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়িয়েছে। এসব গ্রামের অন্তত ১৫শ হেক্টর ধানের জমি এই পানি দিয়ে সেচ দিতে হয়।
ফলে, এসব জমির উর্বরতার শক্তিও দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর পিলখানায় অনুষ্ঠিতব্য দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর অর্ধ-বার্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এই বিষয়টিও উত্থাপন করবে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, আগরতলার ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতাল, ডাইং কারখানা, চামড়া কারখানা, মেলামাইন কারখানা ও বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজ লাইনসহ বিভিন্ন বর্জ্য মিশে সেখানের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই পানি কুচকুচে কালো আর উৎকট গন্ধযুক্ত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম বলেন, আখাউড়া স্থলবন্দরের পাশের সেনারবাদি খাল এবং কালিকাপুর গ্রামের জাজি নদী দিয়ে ওপারের আগরতলা শহর থেকে নেমে আসে ওই দূষিত পানি। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একাধিকবার এই পানি পরীক্ষা করা হয়েছে।
ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ- সিসা, সালফার, দস্তা, ম্যাংগানিজ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও আয়রনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এই পানিতে, বলেন মমিনুল।
আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল কালাম ভূঁইয়া বলেন, এক সময় মিঠা পানির অন্যতম উৎস ছিল এই খালের পানি। অথচ এলাকাবাসী এখন এই খালকে ‘কালন্দী’ (কালো পানির খাল) নামে ডাকে।
বিষাক্ত এ পানি বাংলাদেশে প্রবেশের আগে পরিশোধন করতে ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কিছুই করেনি ত্রিপুরা রাজ্য সরকার। ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি আখাউড়া স্থলবন্দরের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পানীয় জল ও স্বাস্থ্যবিধি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাম কৃপাল যাদব ইটিপি স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। চার বছর পার হয়েছে, কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা জানান, প্রায় ১৫ ফুট প্রশস্ত এই খালের পানিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল বর্জ্য, স্যুয়ারেজ বর্জ্য, পলিথিন ও বিভিন্ন খাবারজাত প্যাকেট, পরিত্যক্ত  প্লাস্টিক ও কাচের বোতল এবং অন্যান্য পচনশীল দ্রব্যের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। চেকপোস্ট সংলগ্ন খালটি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর তিতাস নদীতে যুক্ত হয়েছে। খালটির চার পয়েন্ট থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved Oxzgen) স্তর খুব কম পাওয়া যায়। এ ছাড়াও সিসা, সালফার, দস্তা, ক্রোমিয়াম, ম্যাংগানিজ, ক্যাডমিয়াম ও আয়রনের মতো ভারী রাসায়নিক পদার্থের  অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আখাউড়া স্থলবন্দর সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে সিঅ্যান্ডবি খাল দিয়ে নামছে ওই পানি। এছাড়া সীমান্তবর্তী কালিকাপুর গ্রামের জাজি নদী দিয়ে ও আসছে এই দূষিত পানি। নদীর পানি মোগড়া ইউনিয়নের ধাতুর পহেলা আর নয়াদিল গ্রাম দিয়ে এবং খালের পানি আখাউড়া পৌর এলাকার তারাগণ গ্রাম হয়ে দেবগ্রাম দিয়ে এবং শহরের প্রধান সড়কের পাশ ধরে নেমে এসে মিশে যাচ্ছে তিতাস নদীতে।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, এই কালো পানি আখাউড়া উপজেলার সদর দক্ষিণ ইউনিয়ন ও মোগড়া ইউনিয়ন এবং পৌরসভার একটি অংশের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে কর্মরত বিজিবির জওয়ানরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সেনারবাদি খালের পাড়ে তাদের ক্যাম্প হওয়ায় দিনভর উৎকট এই দুর্গন্ধ সহ্য করে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, বিষাক্ত কালো পানির প্রভাবে ওই এলাকার মানুষ প্রায়ই নানা রকম চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হন। তাছাড়া খাল ও নদীতে মাছও পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আগরতলার দূষিত পানির জন্য এই খালটি মশা, মাছি এবং অন্যান্য পোকামাকড়ের প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তীব্র দুর্গন্ধের কারণে স্থানীয় কৃষকদের পক্ষে ধানের জমিতে কাজ করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স টিএইচও ডা. রাশেদুর রহমান বলেন, দূষিত পানির কারণে পানিবাহিত চর্ম রোগসহ ফুসফুসের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম বলেন, এই পানি ঢাকার মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে পরীক্ষা করে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। পানির মান ভালো না হলেও একমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয় কৃষকরা ব্যবহার করে থাকেন। কৃষি বিভাগের লোকজন প্রায়ই মাঠ দিবসের মিটিংয়ে এ পানি ব্যবহার না করতে কৃষকদের অনুরোধ করেন।
আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ত্রিপুরার সঙ্গে সংযুক্ত খালের পানিতে নাইট্রোজেনের মাত্রা অতিরিক্ত। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই এলাকার কৃষকরা খালে বাঁধ দিয়ে জমিতে পানি ওঠায়। এই পানি জমিতে দেওয়া হলে ধানগাছে পচন ধরে বলে অনেক কৃষক জানিয়েছেন।
আখাউড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ী নেতারা ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা অনেক বছর ধরে কালো পানির সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকতে দেওয়া যায় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবির পরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান  বলেন, আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের পাশের খাল দিয়ে ভারত থেকে বর্জ্য প্রবেশের বিষয়টি আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে। এ ধরনের বর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজিবি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
২০২০© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ*
সহযোগিতায় রায়তা-হোস্ট ডিজাইন : SmartiTHost
desharkontho-lite